করোনা মহামারি এবং চলমান রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে সৃষ্ট বৈশ্বিক সংকটের প্রভাব বাংলাদেশের ওপরও পড়েছে। এসব সংকটের কারণে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের মূল্যসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বৃদ্ধি পেয়েছে। আমেরিকার সেঙ্কশন এর কারণে প্রত্যেকের জীবনটা দুর্বিষহ হয়ে যাচ্ছে কারন এর ফলে বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম বেড়েই চলেছে। ২০২০ সালে যে গ্যাস প্রতি ইউনিট ৪ মার্কিন ডলারে কেনা গেছে, তা এখন বেড়ে ৩৮ ডলার ছাড়িয়েছে। দেশের বেশিরভাগ বিদ্যুৎকেন্দ্র গ্যাসনির্ভর।ফলে গ্যাস সরবরাহের অভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। ইউরোপের বিভিন্ন দেশে যেখানে কোনো সময় বিদ্যুৎ যায় না, সেখানেও নানাভাবে লোডশেডিং হচ্ছে। জাপানের আয় বাংলাদেশের চেয়ে ২০ শতাংশ বেশি। সেখানেও লোডশেডিং হচ্ছে।
যুদ্ধের কারণে বিশ্বজুড়ে খাদ্য ও জ্বালানির তীব্র সংকট সৃষ্টি হয়েছেঃ বর্তমানে বিশ্বের প্রায় সব দেশে জ্বালানি তেলের দামের ঊর্ধ্বগতি দেখা যাচ্ছে। বাস্তবতার কারণে বাংলাদেশেও জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো হয়েছে। ফেব্রুয়ারিতে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হলে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম প্রতি ব্যারেল ৮০ টাকা থেকে ১৩৯ টাকা ছাড়িয়ে যায়। মার্চে তা বেড়ে ১৫৬ দশমিক ৩ ডলারে গিয়ে পৌঁছে। তেলের এ দাম বৃদ্ধি ছিল ১৪ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। তখন আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গেই দেশে তেলের দাম বাড়ানো হয়নি।ফলে ছয় মাসে (ফেব্রুয়ারি-জুলাই) জ্বালানি তেল বিক্রয়ের (সব পণ্য) আট হাজার ১৪ কোটি ৫১ লাখ টাকা লোকসান দিয়েছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)। আন্তর্জাতিক তেলের বাজারের এমন পরিস্থিতির কারণে বিপিসির আমদানি কার্যক্রম স্বাভাবিক রাখতে মূল্য সমন্বয় করা হয়। শুধু বাংলাদেশে নয়, আমাদের আশপাশের প্রতিবেশী দেশগুলোতেও দাম বাড়ানো হয়েছে।বর্তমানে হংকংকে লিটারপ্রতি ডিজেলের দাম (বাংলাদেশি টাকায়) ২৬০ দশমিক ৭৫ টাকা ও অকটেনের দাম ২৮৪ দশমিক ৭২ টাকা, সিঙ্গাপুরে ডিজেলের লিটারপ্রতি দাম ১৮৯ দশমিক ৮৭ টাকা ও অকটেনের লিটারপ্রতি দাম ১৯০ দশমিক ৪৫ টাকা, পাকিস্তানের ডিজেলের লিটারপ্রতি দাম ১০৩ দশমিক ৭১ টাকা ও অকটেনের দাম ১০৬ দশমিক ৬৪ টাকা, নেপালের ডিজেলের লিটারপ্রতি দাম ১২৭ দশমিক ৮২ টাকা ও অকটেনের লিটারপ্রতি দাম ১৩৪ দশমিক ৫৫ টাকা, চীনে ডিজেলের লিটারপ্রতি দাম ১১৮ দশমিক ৬৩ টাকা ও অকটেনের দাম ১৩১ দশমিক ৯৯ টাকা, ভারতে ডিজেলের লিটারপ্রতি দাম ১১০ দশমিক ৯৫ টাকা ও ১২৩ দশমিক ৬৫ টাকা।বর্তমানে বিশ্বের ২য় সর্বোচ্চ তেল উৎপাদনকারী দেশ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি লিটার জ্বালানি তেলের মূল্য বাংলাদেশি মুদ্রায় ১৩৫ টাকা। যা গত মে মাসে ছিল ৫৫ টাকা। ফ্রান্সে প্রতি লিটার অকটেন বাংলাদেশি মুদ্রায় ২২০ টাকা, পেট্রোল ২৩২ টাকা ও ডিজেল ২২৪ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। আয়ারল্যান্ডে ২ মাস আগে যেখানে পেট্রোল ছিল বাংলাদেশি মুদ্রায় ১৩০ টাকা তা এখন বিক্রি হচ্ছে ২০০ টাকা। দক্ষিণ কোরিয়াতে প্রতি লিটার ডিজেল বিক্রি হচ্ছে বাংলাদেশি মুদ্রা ১৪৪ টাকা। অস্ট্রেলিয়ায় দফায় দফায় বাড়ছে তেলের দাম, সেখানে প্রতি লিটার পেট্রোল বিক্রি হচ্ছে বাংলাদেশি মুদ্রায় ১৫০ টাকা আর ডিজেল ১৬০ টাকায়। জার্মানিতে ডিজেলের বর্তমান দাম লিটার প্রতি ১৮৯ টাকা ও পেট্রোল ১৭৫ টাকা। মালদ্বীপে পেট্রোলের দাম লিটার প্রতি ১০২.৬১ টাকা ও ডিজেল ১০৩.৯৮ টাকা। নেপালে লিটার প্রতি পেট্রোলের দাম ১৩৫.৩৬ টাকা, ডিজেল ১২৮.৬৩ টাকা এবং কেরোসিন ১২৮.৬৩ টাকা। ভোক্তা পর্যায়ে ইউরোপ-আমেরিকাসহ উন্নত দেশে ৫০% থেকে ৫৫% পর্যন্ত জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি করা হয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশ সরকার ২০১৬ সাল থেকে গত ৬ বছরে পেট্রোল ও অকটেনের মূল্য এক টাকাও বৃদ্ধি করেনি।
এমন বৈশ্বিক সংকট উত্তরণে পৃথিবীর অন্যান্য রাষ্ট্রের মতো আমাদের দেশের অর্থনীতিকে স্থিতিশীল রাখার জন্য বাংলাদেশ সরকারের জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধি করা ছাড়া অন্য কোনও উপায় ছিল না।বাংলাদেশে তেলের সরবরাহের কোনও প্রকার ঘাটতি নেই। এই নিয়ে আতঙ্কিত হওয়ার কোনও সুযোগ নেই। ভবিষ্যতে যাতে কোনও প্রকার ভয়াবহ সংকট সৃষ্টি না হয় তাই এই ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।
আপনার মতামত লিখুন :