যশোরে ঝিকরগাছা উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের দুর্নীতির লাগাম টানা যাচ্ছেনা কোনমতে। পতিত সরকারের ধারাবাহিক রন্ধ্রে-রন্ধ্রে সৃষ্ট সীমাহীন দুর্নীতি, স্বেচ্ছাচারিতা, অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনার পাশাপাশি এখানে চলে এসেছে স্বজনপ্রীতি, দল প্রীতির নজিরবিহীন অসংখ্য ঘটনা।
উপজেলার বিভিন্ন ব্লকের উপকারভোগী কৃষকদের স্বার্থে সরকার প্রদত্ত ১৩টি কম্বাইন হারভেস্টার মেশিন (ধান,গম, ভুট্টা) পাঁচ কোটি টাকার (কমবেশি হতে পারে) ভর্তুকির এই স্বয়ংক্রিয় ও আধুনিক যন্ত্রগুলোর কার্যত সাধারণ কৃষকের কোন উপকারে আসেনি। বরং ক্ষমতার প্রভাব খাটিয়ে দলীয় পরিচয়ে কৃষক নামধারী ব্যক্তিরা বরাদ্দ নিয়ে যতেচ্ছাভাবে ব্যবহার করে চলেছেন এমন গুরুতর অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগ ওঠে, বরাদ্দকৃত এই হারভেস্টার মেশিন উচ্চমূল্যে বিক্রির মাধ্যমে তা হাতবদল করা হয়েছে । এই মেশিনগুলো কোথায় কি অবস্থায় এবং প্রকৃত কৃষকদের মাঝে বরাদ্দ দেয়া হয়েছে কিনা এ প্রতিনিধি তা অনুসন্ধান করে চলেছেন।
জানা গেছে, বিভিন্ন প্রজেক্ট বাস্তবায়নের নামে চলেছে সরকারের বরাদ্দকৃত অর্থের হরিলুট। দুর্নীতির এই মচ্ছবের ভাগীদার হয়েছেন পতিত সরকারের দলবাজ নেতারা। কৃষকদের তালিকা প্রণয়ন, যাচাই-বাছাই, কৃষি প্রশিক্ষণ, সম্মানীভাতা, আপ্যায়ন খাতের দীর্ঘ তালিকা তো রয়েছেই। মোটা দাগে সরকার প্রদত্ত বিনামূল্যের (ভর্তুকি) সার, বীজ,কিটনাশক, বালাইনাশক, ভর্তুকির নগদ অর্থ প্রদান ইত্যাদিতেও পরতে পরতে রয়েছে দুর্নীতির গন্ধ। আর এসব দুর্নীতির মাধ্যমে লোপাট হয়েছে সরকারি বরাদ্দের লাখ লাখ টাকা। সেই ধারাবাহিকতার লাগাম টেনে ধরার কোনো লক্ষণ এখনো দেখা যাচ্ছে না। বরং পতিত সরকারের রেখে যাওয়া দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের পদাঙ্ক অনুসরণ করে চলেছেন বর্তমানে দায়িত্বপ্রাপ্তরা এখনো। দুর্নীতি এখনও রয়ে গেছে সমানতালে-ধারাবাহিক নিয়মে।
অভিযোগ ওঠে, কর্তা বদল হলেও বদলায়নি দুর্নীতির নানাবিধ দুর্নীতির চিত্র। অভিযোগ রয়েছে, সরকার অনুমোদিত ১৭ জন বিসিআইসি সার ডিলারদের কার থেকে কৃষি বিভাগের উপরি কর্তাদের নামে মাসোয়ারা আদায়, নানা দিবস ও অনুষ্ঠানাদি পালনের অজুহাতে মোটা অংকের অর্থ আদাই যেন রেওয়াজে পরিণত হয় উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগ।
কৃষকদের মাঠদিবস পালন অনুষ্ঠানে সরকারি তরফে বরাদ্দের ক্ষেত্রেও নেওয়া হয় দুর্নীতির আশ্রয়। কাগজে-কলমে সব ঠিকঠাক থাকলেও বরাদ্দ বিতরণের সব খাতে চলে আসছে হিসাবের নয়ছয়। অভিযোগ উঠেছে এসব কিছুর নাটের গুরু নয়ন পাল।
বহুল আলোচিত নয়নান্দন পাল ২০১১ সালের ২৭ ডিসেম্বর উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা হিসেবে ঝিকরগাছা উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরে যোগদান করেন। যদিও সেই সময়ে তার পদবী ছিল ব্লক সুপারভাইজার বা (বিএস)। অভিযোগ ওঠে তার কর্মস্থল উপজেলার বাঁকড়া ইউনিয়নের উজ্জলপুর-দিগদানা ব্লকের হলেও তিনি সেখানে কখনো যাননি। সেখানকার কোন কৃষক তাকে চেনেও না। সেই থেকে তিনি ঝিকরগাছা উপজেলা সদর কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগে কর্মরত আছেন। ইতোমধ্যে তিনি একযুগ পার করেছেন একই কর্মস্থলে।
অভিযোগ রয়েছে, কর্তাদের বিশেষ আশীর্বাদপুষ্ট হওয়ায় এই নয়নান্দন বাবু বিশ্বস্ত আস্থাভাজন হন নিজ কর্মদক্ষতার গুণে। কর্তার ইচ্ছায় ও আদেশে তিনি সব কার্য সম্পাদনে সিদ্ধহস্ত! বার্ষিক কৃষিমেলা উদযাপন, কৃষি প্রদর্শনী, প্লট বরাদ্দকরণ, কৃষকদের তালিকা প্রণয়ন, প্রশিক্ষণে অংশগ্রহণ, সম্মানীভাতা ও আপ্যায়ন খরচ নির্ধারণ, বৃক্ষ চারা বিতরণ, সার, বীজ, কীটনাশকসহ সবধরনের প্রণোদনের তালিকা চূড়ান্তকরণ, কম্বাইন হারভেস্টার মেশিনসহ অন্যান্য কৃষি যন্ত্রপাতি বিতরণ, বিসিআইসি সার ডিলারদের বাফার স্টক থেকে আমদানিকৃত সারের মজুদ ও বিপণন রেজিস্টার তিনি মূলত সংরক্ষণ ও তদারকির গুরুদায়িত্ব পালন করেন। ক্ষেত্রবিশেষ কর্তার নির্দেশে নীতি নির্ধারণী দায়িত্ব পালন করায় উপ-সহকারী অনেক কৃষি কর্মকর্তা তার উপর বেজায় ক্ষুব্ধ ও নাকষ। তবুও প্রকাশ্যে তার বিরুদ্ধে টুশব্দটি করার সাহস কারণ নেই। কারণ, কর্তার আশীর্বাদের হাত তার মাথার উপর।
ফলশ্রুতিতে একই কর্মস্থলে তিনি কাটিয়ে চলেছেন একযুগ। আছেন স্বপদে বহাল তবিয়তে। তার বিরুদ্ধে এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে তিনি অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, কর্তার ইচ্ছায় ও নির্দেশে তিনি অফিসিয়ালি গুরুত্বপূর্ণ দায়-দায়িত্ব পালন করছেন মাত্র।
এ ব্যাপারে উপজেলা কৃষি অফিসার কৃষিবিদ মো. জাহাঙ্গীর আলমের প্রতিক্রিয়া জানতে চাইলেন তিনি বলেন, আমি মাত্র মাস দুই এক এখানে যোগদান করেছি। অতীতের বিষয়গুলো নিয়ে এই মুহূর্তে কোন মন্তব্য করতে চাই না। তবে অভিযোগগুলো খতিয়ে দেখে কার্যকর ব্যবস্থা নেব।
আপনার মতামত লিখুন :